হাওরের বুকে পাগলাটে দিন
কিশোরগঞ্জ ফাউন্ডেশন ব্লগ

হাওরের বুকে এক পাগলাটে দিন: "নৌকা ভ্রমণ ২০২৬"

নিকলী থেকে মিঠামইন হয়ে ঘোড়াদিয়া — গান, লুডু, বিগড়ে যাওয়া বাস আর বারো বছর পর দেখা হওয়া বন্ধুদের গল্প।

নৌকা ভ্রমণ ২০২৬

কিশোরগঞ্জের হাওরে ঘুরতে যাওয়া মানেই আকাশ আর পানির একসাথে মিশে গিয়ে ঘোষণা করা, "আজ আমাদের ছুটি!" আর সেই ছুটির দিনে যদি একদল খোলা মনের বন্ধু, একটা দারুণ ইঞ্জিনসহ আর অফুরন্ত ফুয়েলসহ বিশাল কাঠের নৌকা, ভারী ভারী খাবার রাখতে দুর্বল ওয়ানটাইম প্লেট আর অফুরন্ত হাসাহাসি একসাথে জড়ো হয়, তাহলে যা তৈরি হয়, তার নামই আমাদের "নৌকা ভ্রমণ ২০২৬"। নিকলী থেকে মিঠামইন হয়ে ঘোড়াদিয়া পর্যন্ত এই যাত্রাটা আসলে কেবল একটা ভ্রমণ ছিল না, ছিল ক্ষণস্থায়ী একটা পুরোদস্তুর আনন্দের কারখানা।

সকালে বাসে চড়ার সময় কেউ ভাবেনি সামনে কী অপেক্ষা করছে। কিছুদূর যেতে না যেতেই বাস বিগড়ে বসল, প্রায় ঘণ্টাখানেক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে টেনশনে মাথা প্রায় খারাপ হওয়ার জোগাড় ছিল আমাদের, কিন্তু বন্ধু মহলে টেনশন বেশিক্ষণ টেকেনি — বরং সেই বিগড়ে যাওয়া বাসই এখন অনেকের প্রিয় গল্প, আর সেই গল্প বলার সময় এখন সবাই একসাথে হেসে গড়িয়ে পড়ে। যাই হোক, শেষমেশ বাস গন্তব্যে পৌঁছাল এবং আমাদের জলজ উড়োজাহাজে ওঠা হলো। কিশোরগঞ্জ ফাউন্ডেশনের উপহারের সাদা টি-শার্ট পরে পুরো দল রেডি, আর তারপর থেকে সারাটা দিন একটানা এক নাটক, গল্প, গান আর আড্ডা। যারা চেষ্টা করেও যোগ দিতে পারেনি, তাদের মিস করে অনেকেই মন খারাপ করে বা বন্ধুবৎসল গালি দিতে দিতে ভেবেছে, "বন্ধু, তুই থামলি কেন?"

হাওরের রূপ যেন আঁকা ছবি

হাওরের দৃশ্য

হাওরের রূপ ছিল আঁকা ছবির মতো, ভুলিয়ে দিয়েছিল সবার সব দুশ্চিন্তা। মানুষ নৌকা বা রিসোর্ট বুকিং দেয়, আর আমাদের সেদিনের আবহাওয়াটাই যেন আগে থেকেই বুকিং করা ছিল, এতো সুন্দর! অভিজ্ঞরা বলেন, বর্ষা আর বৃষ্টি ছাড়া হাওর দেখা অসম্পূর্ণ, আবার ঝুম বৃষ্টির সময় হাওর হয়ে ওঠে বিপদজনক, দেখা যায় না কিছুই — কিন্তু আমাদের সকাল ছিল রোদ ঝলমলে, বিকেলে ছিল মেঘ আর বাতাসের মিষ্টি খুনসুটি। ভীষণ রোদও না, বৃষ্টিও না, প্রকৃতিটাই ছিল অন্যরকম আবেদনময়ী! দিনটা যেন সেজেগুজে আমাদের বরণ করে নিতে অপেক্ষা করছিল। হাওরের পানি আর ঢেউয়ের সেই দৃশ্য, দূরে সবুজের সারি, মাথার ওপর বিশাল খোলা আকাশ, মৃদুমন্দ হাওয়া — এসব দেখে মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও যেন সেদিন একটু বেশিই সেজেছে, যেন সবাইকে মুগ্ধ করার পরিকল্পনা ছিল তার আগে থেকেই।

বিকেলের আকাশ

সবচেয়ে বেশি মন কেড়েছে চেয়ারম্যান রিসোর্টের সেই সময়টা। এখানে বসে সূর্যাস্তের সময় আকাশ দেখার অনুভূতি এখনও সবার চোখে লেগে আছে। পানি, রোদ আর নিজেকে মিশিয়ে গলা ছেড়ে বন্ধুদের মিছে দুনিয়া আর খাঁটি প্রেম বিষয়ে গভীর সব দর্শন সম্বৃদ্ধ গানে সৃষ্টি হয়েছিল এক দৃশ্য, যেটা স্পিলবার্গ, হিচকক, নোলান বা আমাদের কাজী হায়াৎ কোটি টাকা দিয়েও বানাতে পারবেন না। আর রিসোর্টের এক পোষা কুকুর তো ইমোশনাল হয়ে আমাদের নৌকা পর্যন্ত দৌড়ে এসেছিল, বিদায়টা মেনে নিতেই পারছিল না বেচারা।

অধিবাসীরা তো বটেই, আমাদের ভ্রমণ সহযোগীরা তো বটেই, ঐ এলাকার পশুপাখিদের মনেও আমাদের দলটাকে পছন্দ করার মতো কিছু একটা ছিল — এখান থেকেই বোঝা যায়, "নৌকা ভ্রমণ ২০২৬"-এ যারা সমবেত হয়েছিলাম, আমরা সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে "বন্ধু" হতে জানি।

প্লেটোর থুক্কু, শক্তিশালী প্লেটের কাহিনি

দুপুরের খাবার

শহরের রেস্টুরেন্টে সহজলভ্য রুই কাতলা বাদ দিয়ে পরিকল্পনা ছিল নিকলীর ছোট ছোট নদীর সব মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার। অনেকের কাছেই এটা ছিল একেবারে "জীবনে প্রথমবার ছোট মাছের স্বাদ", আবার অনেকের জন্য ছিল "হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সুস্বাদু মাছগুলো" ধরনের অভিজ্ঞতা। সেই উপলক্ষে ছিল পাঁচমিশালি মাছ, বিভিন্ন ধরনের মাছ ভর্তা, আরও কত কী… ভাবলে এখনো জিভে জল চলে আসে। সেলিম, নূর এবং অন্যদের পাশাপাশি নিকলীর বন্ধুদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই এতো মজার মজার খাবার জোগাড় হয়েছিল, আর সেই স্বাদ আজও কারো কারো মুখে লেগে আছে বলে জমজমাট প্রায় প্রতিটি আড্ডায় শোনা যাচ্ছে।

খাবারের আসল মজার ঘটনা ঘটেছিল পাতলা ওয়ানটাইম প্লেট নিয়ে। আমাদের "বিদেশি, শক্তিশালী এবং স্টেইনলেস স্টিল গ্রেডের" ওয়ানটাইম প্লেট এতটাই দুর্বল ছিল যে এক বন্ধু ডাল নিতেই গিয়ে পড়ল আরেকজনের পায়ে, কিন্তু দোষটা গিয়ে শেষমেশ বর্তাল একেবারে নিরপরাধ তৃতীয় এক বন্ধুর ঘাড়ে! যে বেচারা কিছুই করেনি, শুধু ভুল সময়ে ভুল জায়গায় বসেছিল। নিরপরাধ হবার অপরাধে তার দ্রুত উপযুক্ত বিচারও হয়ে গেল। হাওরে বসে এমন "প্লেট-কেন্দ্রিক বিচারসভা" বোধহয় আর কোথাও কখনো দেখা যায়নি।

নৌকায় যা যা হলো: গান, লুডু, আর প্রাণখোলা হাসাহাসি

নৌকায় আড্ডা

নৌকায় বসে থাকা মানে আমাদের কোনো ফাঁকা মুহূর্ত ছিল না। লুডু, তাস, আড্ডা, গল্প, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থেকে সাহিত্য-দর্শন — কোনো কিছুই বাদ যায়নি। আর গানের রাজা হিসেবে সবার মুখে মুখে ঘুরছিল রাজনের নাম। তার প্রেমের গান শুনে নাকি সবাই এতটাই মুগ্ধ হবে বলে নিশ্চিত ছিল যে, তার গলাটা "টিউন" করতে রীতিমতো কাঠকয়লা পুড়িয়ে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল! শুনতে হাস্যকর লাগলেও এটাই এখন বন্ধুমহলের কিংবদন্তি, "রাজনের গলা ঠিক করার দিন।"

দিনের সবচেয়ে হাসির ঘটনা ঘটল যখন এক বন্ধু হঠাৎ অচেনা একটা ছেলের হাত ধরে জোরে টান দিয়ে বসল। ছেলেটা ভয় পেয়ে এমন দৌড় লাগাল যে গোটা নৌকাসুদ্ধ সবাই হেসে কুটিকুটি। এই গল্প বা ঐ দৃশ্যই এখন সবার মুখে মুখে, সারাজীবন মনে রাখার মতো একটি হাসির খোরাক হয়ে গেছে।

বারো বছর পর দেখা: বন্ধুত্বের আসল চমক

পুনর্মিলন

এই ট্রিপের সবচেয়ে ইমোশনাল টুইস্টটা ছিল রিইউনিয়ন। ঢাকা থেকে হঠাৎ দশজন পুরনো বন্ধু হাওরে চলে এলো, আর প্রায় বারো বছর পর তাদের সাথে অনেকের দেখা হয়ে গেল! এমনকি একজন বন্ধু তো আরেকজনকে প্রথমে চিনতেই পারল না — সময়ের বিবর্তনে মানুষ কতটা বদলে যায়, এটাই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। কেউ কেউ আবার ছোটবেলার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে সেই পুরনো খুনসুটি নতুন করে বা একই উপায়ে ফিরিয়ে আনলেন। বন্ধুত্বের এই টানটাই বোধহয় পুরো ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য, বাকি সবকিছু তো উপলক্ষ মাত্র।

তথ্য সংগ্রহ প্রতিযোগিতা: বিজয়ী কে?

এই লেখাটা দাঁড় করাতে যাঁরা সাহায্য করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের অবদানই দারুণ।

রবিন ব্যাংকার

জুম্মার নামাজ আর হাওরের ঢেউয়ের সুন্দর বর্ণনা

মাহবুব (টিংকু)

রিসোর্টের ইমোশনাল কুকুর আর লুডু-তাসের গল্প

মিঠুন দত্ত

রাজনের গান আর রিসোর্টের নরম বাতাসের অনুভূতি

আরও যাঁরা পাশে ছিলেন

প্রতিটা ছোট ছোট গল্পই এই লেখাকে সমৃদ্ধ করেছে

কিন্তু সবচেয়ে বিস্তারিত, প্রাণবন্ত আর তথ্যবহুল রেসপন্সটা জমা দিয়েছে বন্ধু নূর জনি। বাস নষ্ট হওয়ার টেনশন থেকে শুরু করে বারো বছর পর বন্ধুদের সাথে দেখা, ফুটবল ম্যাচের গল্প, আর টি-শার্ট স্পনসর করার জন্য ইব্রাহিম খলিলকে ধন্যবাদ জানানো পর্যন্ত — প্রতিটা খুঁটিনাটি ছিল তাঁর বর্ণনায়। এত তথ্য একজনের কাছ থেকে পাওয়া মানে হয় তিনি সারাক্ষণ চোখ-কান খোলা রেখেছিলেন, নয়তো তাঁর নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা ঈর্ষণীয়!

🏆

"কিশোরগঞ্জ ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত আনুষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম ০০১"-এর বিজয়ী: নূর জনি

অভিনন্দন! ট্রফিটা কাল্পনিক কিন্তু সম্মানটা একদম মন থেকে। হাইপেশিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত সুখপাঠ্য একটি বই এবং অনলাইন রিকগনিশন সার্টিফিকেট পুরস্কার হিসেবে দ্রুতই পৌঁছে যাবে আমাদের প্রিয় "কিশোরগঞ্জ ফাউন্ডেশন"-এ, সেখান থেকে সরাসরি পৃথিবীর আলোর হাতে।

আর হ্যাঁ, একজন বন্ধু সোহান এমনভাবে তথ্যগুলো জমা দিয়েছিলেন যে পুরোটাই ছিল "আই সবনাস, আরে ওইদিন তো আমি যাইই-নি!" ধাঁচের নির্ভেজাল রসিকতা! না গিয়েও তিনি পুরো ভ্রমণটা এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যা পড়তে গেলে চোখ, বুঝতে গেলে মাথা, আর বলতে গেলে পেট ব্যথা হয়ে যায়। এই কার্যক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কোনো তথ্য জমা না দিলেও, "সবচেয়ে মজার অনুপস্থিত ভ্রমণকারী" অ্যাওয়ার্ড বা দণ্ডটা নির্দ্বিধায় তাঁর প্রাপ্য!

বিশেষ ঘোষণা

কিশোরগঞ্জ ফাউন্ডেশনের ডাটা মেইনটেন্যান্স টিমের পক্ষ থেকে সিঙ্গার/চাচা/মামা সোহানকে কলাবাগান রিসোর্টে দুটো আরএফএল গার্ডেন চেয়ার অ্যাওয়ার্ড হিসেবে দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দিতে বা বুঝে নিতে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হলো। নতুবা টিমের পক্ষ থেকে, কিশোরগঞ্জ ফাউন্ডেশনের কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে উনার জমা দেয়া ফর্মটা, উনার ছবি, সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল, জিমেইল এবং আইপি ঠিকানাসহ পাবলিক ডোমেইনে সাবমিট করা হবে।

অন্য সকল বন্ধু, যাদের উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানটাকে সাফল্যমণ্ডিত করেছে, তাদের জন্য শুভকামনা, ভালোবাসা এবং পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি।

শেষকথা

দিনশেষে সবার মুখে ছিল একটাই কথা — "চমৎকার অনুভূতি, প্রতি বছর এমন একটা ভ্রমণ দরকার।" পানিতে গোসল, রিসোর্টে গান, বারো বছর পর বন্ধুর সাথে দেখা, বাস বিগড়ে যাওয়া আর নৌকার সেই আড্ডা, হুটোপুটি — এই ধরনের স্মৃতিগুলো নিয়েই তো টিকে থাকে বন্ধুত্ব। "নৌকা ভ্রমণ ২০২৬" তাই শুধু একটা ভ্রমণ নয়, এটা মনে করিয়ে দেওয়া যে, জীবনটাকে মাঝে মাঝে থামিয়ে, দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বন্ধুদের নিয়ে প্রকৃতির মাঝে খোলামনে ভেসে বেড়াতে হয়।

পরের ভ্রমণে আবার দেখা হচ্ছে বন্ধুরা 🚤🌅

সেবার প্লিজ… ভাত খাওয়ার প্লেটটা আরেকটু শক্ত দেখে এনো!

কিশোরগঞ্জ ফাউন্ডেশন — নৌকা ভ্রমণ ২০২৬